মজিজা ও কেরামত কী? আউলিয়াগণের অলৌকিকতার আসল রহস্য

 ইসলামে অলৌকিক বা সাধারণ নিয়মের বাইরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে প্রধানত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় হলো মজিজা (মুজিজা) এবং কেরামত। এগুলোর অর্থ এবং আউলিয়ায়ে কেরামের কেরামত প্রদর্শনের বিষয়টি নিচে সহজভাবে আলোচনা করা হলো:



​মজিজা ও কেরামত কী?

​১. মজিজা (المعجزة)

​মজিজা হলো এমন অলৌকিক ঘটনা, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী ও রাসুলদের মাধ্যমে প্রকাশ করেন।

  • উদ্দেশ্য: নবুয়তের দাবিকে সত্য প্রমাণ করা এবং অবিশ্বাসীদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা।
  • বৈশিষ্ট্য: এটি সাধারণত প্রকাশ্যে এবং চ্যালেঞ্জ আকারে নবীগণের মাধ্যমে আল্লাহ প্রকাশ করেন, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে করা অসম্ভব। যেমন: হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর জন্য আগুন ঠান্ডা হওয়া, হযরত মুসা (আ.)-এর লাঠি সাপে পরিণত হওয়া, কিংবা আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আঙুলের ইশারায় চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়া।

​২. কেরামত (الكرامة)

​কেরামত হলো এমন অলৌকিক বা ব্যতিক্রমী ঘটনা, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর কোনো মকবুল বা প্রিয় বান্দা (আউলিয়া/আল্লাহর ওলি)-র মাধ্যমে প্রকাশ করেন।

  • উদ্দেশ্য: আল্লাহর ওলির সম্মান বৃদ্ধি করা এবং তাঁর প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ প্রকাশ করা।
  • বৈশিষ্ট্য: কেরামতের ক্ষেত্রে নবুয়তের কোনো দাবি থাকে না এবং এটি কোনো চ্যালেঞ্জ আকারে আসে না। বেশিরভাগ সময় আল্লাহর ওলিগণ এটি গোপন রাখার চেষ্টা করেন। যেমন: হযরত মারিয়াম (আ.)-এর কাছে অসময়ে (শীতকালে গ্রীষ্মের, গ্রীষ্মকালে শীতের) ফল চলে আসা (পবিত্র কুরআনে এটি বর্ণিত হয়েছে)।

​আউলিয়াগণ কীভাবে কেরামত দেখান?

​একটি বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে বোঝা দরকার: কোনো অলৌকিক ক্ষমতা আউলিয়া বা পীর-মাশায়েখদের নিজস্ব বা স্থায়ী কোনো ক্ষমতা নয়। তারা জাদুকরদের মতো যখন-তখন নিজের ইচ্ছায় অলৌকিক কিছু ঘটাতে পারেন না।

​আউলিয়াগণ যেভাবে কেরামত দেখান বা তাদের মাধ্যমে যেভাবে কেরামত প্রকাশ পায়, তা হলো:

  • সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছায়: আউলিয়াগণের গভীর ইবাদত, পরহেজগারি (তাকওয়া) এবং সুন্নতের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণের কারণে আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর সন্তুষ্ট হন। যখন কোনো বিশেষ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর নিজস্ব কুদরতে ওই ওলির মাধ্যমে অলৌকিক কিছু ঘটিয়ে দেন। ওলি বা আউলিয়া হলেন এখানে উসিলা মাত্র, প্রকৃত কর্তা আল্লাহ।
  • দোয়ার মাধ্যমে: অনেক সময় আল্লাহর কোনো ওলি বিশেষ কোনো সংকটে পড়ে বা মানুষের কল্যাণে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে দোয়া করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দার সম্মান রক্ষার্থে সেই দোয়া অলৌকিকভাবে কবুল করে নেন, যা মানুষের কাছে কেরামত হিসেবে প্রকাশ পায়।
  • সুন্নতের অনুসরণের ফল: হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, বান্দা যখন নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে থাকে, তখন আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। একপর্যায়ে আল্লাহ তার কান হয়ে যান যা দিয়ে সে শোনে, চোখ হয়ে যান যা দিয়ে সে দেখে, এবং হাত হয়ে যান যা দিয়ে সে ধরে। অর্থাৎ, তার সমস্ত চাওয়া-পাওয়া আল্লাহর ইচ্ছার সাথে মিলে যায় এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে বিশেষ সাহায্য (কেরামত) দেওয়া হয়।
  • একটি জরুরি সতর্কবার্তা: ইসলামি আকীদা অনুযায়ী, সবচেয়ে বড় কেরামত হলো "ইস্তেকামাত" বা শরিয়তের ওপর শক্তভাবে অবিচল থাকা। যদি কেউ শরিয়ত বা সুন্নতের তোয়াক্কা না করে বাতাসে ওড়ে বা পানির ওপর দিয়ে হাঁটে, তবে ইসলামে সেটাকে কেরামত বলা হয় না, ওটা হতে পারে জাদুটোনা বা "ইস্তিদরাজ" (বিভ্রান্ত করার জন্য শয়তানি ধোকা)। প্রকৃত আউলিয়াগণ কখনো সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য কেরামত প্রদর্শন করেন না, বরং তারা এটাকে গোপন রাখতেই পছন্দ করেন।

Comments