যুদ্ধবিরতির চুক্তি সই হয়েছে দীর্ঘ আট মাস আগে। সাধারণ মানুষের মনে আশা ছিল, হয়তো এবার আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো বোমা পড়া বন্ধ হবে, হয়তো এবার একটু শান্তিতে ঘুমানো যাবে। কিন্তু গাজা উপত্যকার বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সেখানে শান্তির বিন্দুমাত্র আভাস তো নেই-ই, বরং ইসরায়েলি হামলা এবং চরম অমানবিক বাস্তুচ্যুতির সংকট দিন দিন আরও তীব্র ও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
কাগজে-কলমে হওয়া শান্তি চুক্তি আজ কেবলই কিছু অক্ষরের সমষ্টি, যার কোনো প্রতিফলন নেই গাজার মাটিতে।
চুক্তির আট মাস: কী পাওয়ার কথা ছিল, আর কী মিলল?
গত বছরের ১১ অক্টোবর মার্কিন ও ইরানি মধ্যস্থতায় ইসরাইল এবং হামাসের মধ্যে দুই পর্বের একটি ঐতিহাসিক চুক্তি সই হয়েছিল। শর্ত অনুযায়ী কথা ছিল:
গাজা থেকে সম্পূর্ণ ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে।
হামাসের নিরস্ত্রিকরণ করা হবে।
একটি নতুন ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটি বা আন্তর্জাতিক বাহিনীর হাতে গাজার শাসনভার হস্তান্তর করা হবে।
কিন্তু দীর্ঘ আটটি মাস কেটে গেলেও এর একটি শর্তও আলো দেখেনি। তথাকথিত এই যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুর মিছিল থামেনি। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চুক্তি সই হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১,০৫৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৩,৪২৯ জনেরও বেশি। এর চেয়েও বড় নিষ্ঠুরতা হলো, পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চুক্তি সই হওয়ার পর থেকে গাজায় গড়ে প্রতিদিন একটি করে শিশু প্রাণ হারাচ্ছে।
জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গত জুন মাসে স্পষ্ট করে বলেছে, ইসরায়েল গাজায় শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করার মাধ্যমে মূলত ‘গণহত্যা’ চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও বরাবরের মতোই ইসরায়েল এই প্রতিবেদনকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
আশ্রয়শিবিরে নতুন ত্রাস: ঝাঁকে ঝাঁকে বিষাক্ত ইঁদুর
গাজার বাতাস এখন কেবল বারুদের গন্ধেই ভারী নয়, সেখানে যোগ হয়েছে মানবিক বিপর্যয়ের এক নতুন অধ্যায়। দীর্ঘ দুই বছরের বোমা হামলায় পুরো গাজা আজ ধ্বংসস্তূপ। শুধু গাজা সিটি একাই এখন ২৫ মিলিয়ন টন ধ্বংসস্তূপ ও আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় চারপাশ ভেসে যাচ্ছে বর্জ্যরে পানিতে। আর এই চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ডেকে এনেছে এক বিভীষিকা— ইঁদুরের উপদ্রব।
গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ আশ্রয়শিবিরে এখন চর্মরোগ ও মারাত্মক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ঝাঁকে ঝাঁকে বড় বড় ইঁদুর। ‘মেডিকেল এইড ফর প্যালেস্টাইনিয়ানস’ (MAP)-এর জরুরি বিভাগের প্রধান স্যালি সালেহ জানিয়েছেন এক শিউরে ওঠার মতো তথ্য:
"বড় বড় ইঁদুর এখন সরাসরি মানুষের ওপর, বিশেষ করে রাতে ঘুমন্ত শিশু, নবজাতক এবং প্রতিবন্ধী মানুষদের ওপর আক্রমণ করছে। অনেক বাবা-মা সকালে উঠে দেখছেন তাদের সন্তানেরা ইঁদুরের কামড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে।"
যে শিশুরা বোমার আঘাত থেকে কোনোমতে বেঁচে ফিরল, তাদের এখন রাতে ঘুমাতে হচ্ছে ইঁদুরের কামড়ের আতঙ্ক নিয়ে। শুধু তা-ই নয়, এই ইঁদুরগুলো ত্রাণের চাল-ডালের বস্তা কেটে খাবার নষ্ট করছে, ফলে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্যসংকট।
১৯ লাখ মানুষের মানবেতর জীবন
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থাৎ ১৯ লাখেরও বেশি মানুষ বর্তমানে বাস্তুচ্যুত। অপরিসর, বাতাস চলাচলের অযোগ্য অস্থায়ী তাঁবুতে গাদাগাদি করে দিন কাটছে তাদের। যেখানে মাথার ওপর সূর্য তপ্ত আগুন ঢালে, আর নিচে মশা, মাছি, নেকড়ে আর ইঁদুরের বাস। এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে হাজার হাজার মরদেহ নিখোঁজ অবস্থায় পড়ে আছে, যা থেকে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ ও রোগবালাই।
এরই মধ্যে গত মঙ্গলবারও সিএনএনের খবর অনুযায়ী, ইসরায়েলের নতুন হামলায় গাজায় আরও ১ জন নিহত ও ৫ জন আহত হয়েছেন।
শেষ কথা
গাজার এই পরিস্থিতি বিশ্ব বিবেকের মুখে এক মস্ত বড় চড়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যখন প্রতিদিন একটি করে শিশু হত্যার শিকার হয়, যখন জীবন্ত শিশুদের রাতে ইঁদুরে কামড়ে খায়, তখন বুঝতে হবে মানবতা আজ মৃত। গাজার সাধারণ মানুষের এই নরককুণ্ড থেকে মুক্তি কবে, তা আজ বিশ্বনেতাদের কাছে এক মস্ত বড় প্রশ্ন।
Leave a Reply