ইসলামী ইতিহাসের এক রহস্যময় এবং বহুল আলোচিত অধ্যায় হলো হারুত ও মারুত-এর ঘটনা। পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতে এই দুই ব্যক্তিত্বের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যুগে যুগে সাধারণ মানুষের মাঝে তাদের নিয়ে নানাবিধ কাল্পনিক গল্প বা লোককথা ডালপালা মেললেও, কুরআনী বর্ণনা এবং সহীহ হাদিসের আলোকে তাদের প্রকৃত সত্য জানা অত্যন্ত জরুরি।
আজকের ব্লগে আমরা হারুত ও মারুত কে ছিলেন, কেন তাদের পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিল এবং তাদের ঘিরে প্রচলিত মিথ্যা রূপকথাগুলোর আসল সত্য উন্মোচন করব।
১. হারুত ও মারুত কারা ছিলেন?
সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বড় ভুল ধারণা রয়েছে যে, হারুত ও মারুত হয়তো কোনো জিন বা সাধারণ মানুষ ছিলেন। কিন্তু বিশুদ্ধ ইসলামী আকিদা এবং তাফসীর অনুযায়ী, তারা ছিলেন আল্লাহর নির্দেশপ্রাপ্ত দুজন ফেরেশতা।
হযরত সুলায়মান (আ.)-এর রাজত্বকালে ইরাকের প্রাচীন 'বাবেল' বা ব্যাবিলন শহরে আল্লাহ তাআলা এই দুজন ফেরেশতাকে মানুষের বেশে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন।
২. কেন তাদের পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিল?
হারুত ও মারুতকে পৃথিবীতে পাঠানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের ঈমানের পরীক্ষা নেওয়া এবং তৎকালীন সমাজে ছড়িয়ে পড়া জাদুর কুপ্রভাব থেকে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা।
তৎকালীন বাবেল শহরে জাদুকরদের উপদ্রব প্রচণ্ড বেড়ে গিয়েছিল। শয়তান এবং জাদুকররা অলৌকিক সব কাণ্ডকারখানা দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করত এবং দাবি করত যে এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা মোজেজা। জাদুকরদের এই মিথ্যা ও প্রতারণা ফাস করার জন্য আল্লাহ তাআলা এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করেন:
- আল্লাহ হারুত ও মারুতকে জাদুর গোপন রহস্য ও তার কার্যপ্রণালী দিয়ে পৃথিবীতে পাঠান।
- তারা মানুষকে শেখাতেন যে কীভাবে জাদুর প্রভাব থেকে বাঁচা যায় এবং জাদু ও মোজেজার মধ্যে পার্থক্য কী।
- তারা স্পষ্ট করে দিতেন যে, জাদু কোনো ঐশ্বরিক ক্ষমতা নয়, বরং এটি একটি কুফরী বিদ্যা।
৩. পবিত্র কুরআনের বর্ণনা
পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এই ঘটনাটি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন:
"...তারা সুলায়মানের রাজত্বকালে শয়তানদের পঠিত (জাদু) বিদ্যার অনুসরণ করেছিল। অথচ সুলায়মান কুফরী করেননি, কুফরী তো করেছিল শয়তানরাই। তারা মানুষকে জাদু শিক্ষা দিত এবং বাবেল শহরে হারুত ও মারুত নামক দুজন ফেরেশতার ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছিল তা শিক্ষা দিত। আর তারা (ফেরেশতাদ্বয়) কাউকেই এই শিক্ষা দিত না, যতক্ষণ না তারা এই কথা বলত যে— 'আমরা তো কেবল পরীক্ষা স্বরূপ, কাজেই তুমি কুফরী করো না।'..."
আয়াত থেকে প্রাপ্ত মূল শিক্ষণীয় বিষয়:
- সতর্কবার্তা: হারুত ও মারুত স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে জাদু শেখাতেন যে— এটি একটি পরীক্ষা। এই বিদ্যা কুফরী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করলে ঈমান চলে যাবে।
- বিচ্ছেদ সৃষ্টির জাদু: মানুষ তাদের কাছ থেকে এমন জাদু শিখত, যা দিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো যেত।
- আল্লাহর ক্ষমতা: কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া এই জাদু দিয়ে কারও কোনো ক্ষতি করার ক্ষমতা কারও ছিল না।
৪. হারুত ও মারুতকে নিয়ে প্রচলিত মিথ্যা রূপকথা ও তার খণ্ডন
উপমহাদেশসহ বিভিন্ন দেশের লোকসমাজে হারুত ও মারুতকে নিয়ে একটি মুখরোচক গল্প প্রচলিত আছে। গল্পটি এমন:
"ফেরেশতারা নাকি মানুষের পাপ দেখে আল্লাহর কাছে বলেছিল, আমরা মানুষ হলে পাপ করতাম না। তখন আল্লাহ হারুত ও মারুতকে মানবীয় আবেগ দিয়ে পৃথিবীতে পাঠান। পৃথিবীতে এসে তারা 'যোহরা' নামের এক রূপবতী নারীর প্রেমে পড়েন। সেই নারীর প্ররোচনায় তারা মদ্যপান, হত্যা এবং শিরকের মতো পাপ করেন এবং তাকে 'ইসমে আজম' শিখিয়ে দেন। পরবর্তীতে যোহরা আকাশে উঠে তারা (শুক্র গ্রহ) হয়ে যায় এবং হারুত-মারুতকে বাবেলের এক কূয়োয় উল্টো করে কিয়ামত পর্যন্ত ঝুলিয়ে শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়।"
এই গল্পের আসল সত্য কী?
ইসলামী স্কলার এবং মুহাদ্দিসগণের মতে, এই পুরো গল্পটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট এবং একটি 'ইসরাঈলি রেওয়ায়েত' (অন্য ধর্মের বিকৃত গল্প)। ইসলামে এর কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই।
তাত্বিক খণ্ডন:
১. ফেরেশতারা নিষ্পাপ: ইসলাম অনুসারে ফেরেশতারা জন্মগতভাবেই নিষ্পাপ। তারা কখনো আল্লাহর অবাধ্য হন না (সূরা তাহরীম: ৬)। তাই তাদের মদ খাওয়া বা ব্যভিচার করার গল্প কুরআনের মূল আকিদার পরিপন্থী।
২. কূয়োর শাস্তি কাল্পনিক: বাবেলের কূয়োয় তারা শাস্তি পাচ্ছেন— এমন কোনো প্রমাণ সহীহ হাদিসে নেই। তারা তাদের দায়িত্ব শেষ করে আল্লাহর দরবারে ফিরে গেছেন।
শেষ কথা
হারুত ও মারুতের ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আল্লাহ মানবজাতিকে বিভিন্ন উপায়ে পরীক্ষা করেন। জাদুবিদ্যা শেখা বা চর্চা করা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম এবং কুফরী। শয়তানি ধোঁকা এবং জাদুর কুপ্রভাব থেকে বাঁচতে আমাদের সর্বদা পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাহর নির্দেশিত পথ (যেমন: আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করা) অনুসরণ করা উচিত।
ইতিহাসের পাতায় থাকা এই দুই ফেরেশতা কোনো পাপী চরিত্র ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন আল্লাহর এক কঠিন পরীক্ষার মাধ্যম। তাই যেকোনো ধর্মীয় ইতিহাস বিশ্বাসের আগে তার সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করে নেওয়া আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব।

Comments
Post a Comment