জার্মানি দল যখনই খাদের কিনারায় দাঁড়ায় কিংবা বিশ্বমঞ্চের আলোচনায় একটু পিছিয়ে পড়ে, তখনই তারা এমন কিছু করে বসে যা সবাইকে চমকে দেয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে ফুটবল পরাশক্তিদের আড্ডায় জার্মানির নামটা হয়তো কিছুটা নিচেই ছিল। কিন্তু কুরাসাওয়ের বিপক্ষে ৭-১ গোলের বিশাল জয় দিয়ে ডাই মানশাফটরা (Die Mannschaft) স্পষ্ট বার্তা দিল—বিশ্বকাপ ট্রফির দৌড়ে তাদের হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
কুরাসাওকে উড়িয়ে দেওয়ার এই ম্যাচে জার্মানির শুধু গোলক্ষুধা নয়, ফুটে উঠেছে তাদের কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বও। চলুন দেখে নেওয়া যাক, কেন এবারের বিশ্বকাপে জার্মানিকে চ্যাম্পিয়নশিপের অন্যতম দাবিদার ভাবা হচ্ছে এবং এর পেছনে থাকা ৭টি মূল কারণ:
১. সেট-পিসে অপ্রতিরোধ্য জার্মানি
কর্নার হোক কিংবা ফ্রি-কিক, জার্মানির আক্রমণভাগ এখন যেকোনো রক্ষণভাগের জন্য এক আতঙ্কের নাম। সেট-পিস কোচ ম্যাডস বুটগেরাইটের নিখুঁত সব কৌশল মাঠে দারুণভাবে কাজে লাগাচ্ছে দলটি। কুরাসাওয়ের বিপক্ষে নিকো শ্লটারবেকের গোলটি ছিল এর আদর্শ উদাহরণ। কড়া মার্কিংয়ে থাকার পরও নাথানিয়েল ব্রাউনের নিখুঁত পাসে চমৎকার হেডে গোল করেন বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের এই তারকা।
২. ম্যানুয়েল নয়্যারের অভিজ্ঞতা ও মাইলফলক
জার্মানির ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক আন্তর্জাতিক ফুটবলার ম্যানুয়েল নয়্যার এখনো দলের অন্যতম বড় ভরসা। কুরাসাওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে তাকে খুব বেশি পরীক্ষা দিতে না হলেও, যে গোলটি হজম করেছেন সেখানেও তার চেষ্টা ছিল দেখার মতো। পরবর্তী ম্যাচেই গোলকিপার হিসেবে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার অনন্য রেকর্ড গড়তে যাচ্ছেন তিনি। বড় ম্যাচে নয়্যারের এই অভিজ্ঞতাই জার্মানিকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলবে, এমনটাই প্রত্যাশা ভক্তদের।
৩. ছন্দে ফিরেছেন ‘ম্যাজিশিয়ান’ মুসিয়ালা
সাম্প্রতিক সময়ে জার্মান সংবাদমাধ্যমে জামাল মুসিয়ালার ফর্ম নিয়ে কম সমালোচনা হয়নি। তবে সমালোচকদের মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই জবাব দিলেন বায়ার্ন মিউনিখের এই তরুণ তুর্কি। কুরাসাওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে দেখা গেছে তার সেই চিরচেনা ট্রেডমার্ক ড্রিবলিং। বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোলটি পাওয়ার পর মুসিয়ালার আত্মবিশ্বাস যে আরও আকাশচুম্বী হবে, তা বলাই বাহুল্য।
৪. মাঝমাঠে নতুন ‘তিকিতাকা’র নিয়ন্ত্রণ
২০২৪ ইউরোর পর জার্মানি তাদের মিডফিল্ড বা মাঝমাঠকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজিয়েছে। ফেলিক্স এনমেচা ও আলেকজান্ডার প্যাভলোভিচের নতুন জুটি কুরাসাওয়ের বিপক্ষে মাঠে ফুল ফুটিয়েছে। তাদের চমৎকার বোঝাপড়া এবং ছোট ছোট পাসের ‘তিকিতাকা’ গেম পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ জার্মানির হাতে ধরে রেখেছিল।
৫. গোল করার বহুমাত্রিক উৎস
কোনো একক স্ট্রাইকারের ওপর জার্মানি এবার নির্ভরশীল নয়, আর এটাই প্রতিপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ। কুরাসাওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে ৬ জন ভিন্ন ভিন্ন খেলোয়াড় গোল করেছেন। এর মধ্যে কাই হাভার্টজ করেছেন জোড়া গোল। দলের একাধিক খেলোয়াড় গোলস্কোরিং ফর্মে থাকা যেকোনো টুর্নামেন্ট জেতার জন্য বড় টনিক হিসেবে কাজ করে।
এক নজরে রেকর্ড: বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমেই গোল করে বিশ্বকাপে নতুন রেকর্ড গড়েছেন সভানবার্গ!
৬. নাথানিয়েল ব্রাউনের রাজকীয় অভিষেক
আইনট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্টের তরুণ ফুলব্যাক নাথানিয়েল ব্রাউনের আন্তর্জাতিক অভিষেকটা হলো রূপকথার মতো। ডেভিড রাউমের জায়গায় লেফটব্যাক হিসেবে খেলতে নেমে অভিষেকেই করেছেন দারুণ এক গোল। গ্যালারিতে উপস্থিত পরিবারের সামনে করা এই গোলটি ব্রাউনকে আগামী ম্যাচগুলোতে প্রথম পছন্দের লেফটব্যাক হিসেবে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে রাখবে।
৭. ফ্লোরিয়ান ভির্টৎসের নিঃস্বার্থ পারফরম্যান্স
ফুটবলে সব অবদান গোল দিয়ে মাপা যায় না, ফ্লোরিয়ান ভির্টৎস সেটিই প্রমাণ করলেন। নিজে গোল না পেলেও ফেলিক্স এনমেচার প্রথমার্ধের গোলটি তৈরিতে বড় ভূমিকা ছিল তার। শুধু আক্রমণেই নয়, প্রথমার্ধের শেষে কুরাসাওয়ের একটি বিপজ্জনক পাল্টা আক্রমণ রুখে দিয়ে রক্ষণেও নিজের অবদান রেখেছেন। লিভারপুলের হয়ে সাম্প্রতিক খারাপ ফর্মের কারণে সমালোচিত ভির্টৎস বিশ্বকাপের শুরুতেই নিজের চেনা রূপের ইঙ্গিত দিয়ে রাখলেন।
শেষ কথা
একটি বড় জয় হয়তো পুরো টুর্নামেন্টের ভাগ্য নির্ধারণ করে না, তবে কুরাসাওয়ের বিপক্ষে জার্মানির এই দাপুটে ফুটবল বাকি দলগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা। নতুন রক্ত আর অভিজ্ঞতার মিশেলে গড়া এই জার্মান দল যদি তাদের এই ছন্দ ধরে রাখতে পারে, তবে পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি বার্লিনে যাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র!
