পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী জীবনের কোলাহল, ব্যস্ততা আর মোহের ভিড়ে আমাদের আত্মা প্রায়শই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আত্মার এই ক্লান্তি দূর করার একমাত্র উপায় হলো পরম সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সান্নিধ্য অর্জন করা। আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা কেবল পরকালীন মুক্তির পথই নয়, বরং এটি দুনিয়াবি জীবনেও এনে দেয় অসীম শান্তি, স্থিরতা ও সন্তুষ্টি।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন:
"জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই কেবল হৃদয়সমূহ প্রশান্ত হয়।" (সূরা আর-রাদ, আয়াত: ২৮)
কিন্তু কীভাবে আমরা এই মহিমান্বিত সান্নিধ্য অর্জন করতে পারি? আল-কুরআন এবং সুন্নাহর আলোকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রধান প্রধান মাধ্যমগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
১. ফরয ইবাদতসমূহের নিখুঁত পালন
আল্লাহ তাআলার প্রিয়পাত্র হওয়ার প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো তিনি আমাদের ওপর যা ফরয (আবশ্যিক) করেছেন, তা যথাযথভাবে পালন করা। ফরয ইবাদতে অবহেলা করে আল্লাহর নৈকট্য আশা করা যায় না।
একটি বিখ্যাত হাদীসে কুদসীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন:
"আমার বান্দা ফরয কাজসমূহের চেয়ে অন্য কোনো প্রিয় জিনিসের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করতে পারে না..." (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৬৫০২)
তাই পাঁচ ওয়াক্ত সালাত সঠিক সময়ে আদায় করা, রমযানের রোযা রাখা, যাকাত ও হজ্জ (সামর্থ্য থাকলে) আদায় করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে হবে।
২. নফল ইবাদতের প্রাচুর্য
ফরয আদায়ের পর আল্লাহর ভালোবাসার অতি উচ্চ শিখরে পৌঁছানোর মাধ্যম হলো নফল ইবাদত। উপরোক্ত হাদীসে কুদসীর পরের অংশে আল্লাহ বলেন:
"...এবং বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে সর্বদা আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে, যতক্ষণ না আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি।"
ফরযের পাশাপাশি তাহাজ্জুদ সালাত, ইশরাক, চাশতের সালাত আদায় করা, নফল রোযা রাখা এবং দান-সদকা করার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর অত্যন্ত কাছের মানুষে পরিণত হয়। বিশেষ করে রাতের শেষ তৃতীয়াংশের তাহাজ্জুদ সালাত আল্লাহর সান্নিধ্যের এক গোপন দুয়ার খুলে দেয়।
৩. আন্তরিক তাওবাহ ও ইস্তিগফার
মানুষ হিসেবে আমাদের ভুল-ত্রুটি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু গুনাহ করার পর অহংকার না করে আল্লাহর দরবারে অশ্রুসিক্ত নয়নে ফিরে আসাই হলো মুমিনের বৈশিষ্ট্য। তাওবাহ বান্দাকে আল্লাহর অনেক কাছে নিয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাহকারী এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।" (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২২২)
প্রতিদিন শতবার "আস্তাগফিরুল্লাহ" পড়ার অভ্যাস আমাদের অন্তরকে গুনাহের কালো দাগ থেকে মুক্ত করে আল্লাহর নূর গ্রহণের উপযোগী করে তোলে।
৪. জিকর বা আল্লাহর সার্বক্ষণিক স্মরণ
মুখ ও অন্তরকে সর্বদা আল্লাহর যিকিরে ভিজিয়ে রাখা আল্লাহর সান্নিধ্যের অন্যতম সহজ অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম। যিকিরের মাধ্যমে বান্দা সরাসরি আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপন করে।
হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন:
"বান্দা যখন আমাকে স্মরণ করে, আমি তার সাথে থাকি।" (সহীহ বুখারী)
সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার—এই তাসবীহগুলো পড়ার মাধ্যমে আমাদের দিনটিকে বরকতময় করে তুলতে পারি।
৫. আল-কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন
কুরআন হলো মহান আল্লাহর কালাম বা বাণী। যখন আমরা কুরআন তিলাওয়াত করি, মূলত আমরা আল্লাহর সাথে কথা বলি। আল্লাহর সান্নিধ্য পেতে হলে প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় কুরআনের অর্থসহ তিলাওয়াত, তা নিয়ে চিন্তা-গবেষণা (تدبر) এবং সেই অনুযায়ী জীবন গড়া আবশ্যক।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যারা কুরআনের সাথে সম্পর্ক রাখে তারা হলো "আহলুল্লাহ" বা আল্লাহর পরিবারভুক্ত লোক। (সুনানে ইবনে মাজাহ)
৬. আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি দয়া ও সদাচরণ
আল্লাহর সান্নিধ্য কেবল জায়নামাজে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ছড়িয়ে আছে তাঁর সৃষ্টির সেবার মাঝেও। সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতিশীল হলে স্রষ্টার করুণা পাওয়া যায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"দয়াশীলদের ওপর পরম দয়াময় (আল্লাহ) দয়া করেন। তোমরা জমিনের অধিবাসীদের প্রতি দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন (আল্লাহ) তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।" (সুনানে আবু দাউদ)
অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া, এতীমের মাথায় হাত রাখা এবং মানুষের সাথে সুন্দর আচরণের মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়া যায়।
৭. দোয়া ও বিনম্রতা
আল্লাহর কাছে নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে আকুলভাবে প্রার্থনা করা ইবাদতের মূল মজ্জা। আমরা যখন সিজদায় গিয়ে আল্লাহর কাছে আমাদের দুঃখ-কষ্টের কথা বলি, অশ্রু বিসর্জন দিই, তখন আমরা আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হই।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"বান্দা যখন সিজদারত থাকে, তখন সে তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়। অতএব, তোমরা সিজদায় বেশি বেশি দোয়া করো।" (সহীহ মুসলিম)
শেষ কথা
আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন কোনো একদিনের বিষয় নয়, এটি একটি আজীবনের পথচলা বা সাধনা। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহ থেকে অন্তরকে মুক্ত করে আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়াই এই পথের মূল মন্ত্র। আসুন, আজ থেকেই আমরা ছোট ছোট কদম ফেলে আমাদের রবের দিকে এগিয়ে যাই। আমরা যদি আল্লাহর দিকে এক বিঘত এগিয়ে যাই, তিনি আমাদের দিকে এক হাত এগিয়ে আসবেন!
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর খাঁটি ও প্রিয় বান্দা হিসেবে কবুল করুন এবং তাঁর চিরস্থায়ী সান্নিধ্য নসীব করুন। আমীন।

Comments
Post a Comment