"বাবা হিসেবে শেষ অনুরোধ, তুমি খেলা চালিয়ে যাও"—নেইমারকে তাঁর বাবার আবেগঘন চিঠি

 


মেটলাইফ স্টেডিয়াম—২০১১ সালে ঠিক এই মাঠেই ব্রাজিলের বিখ্যাত হলুদ জার্সিতে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল এক রোগা-পাতলা, চুলে স্পাইক করা বিস্ময় বালকের। ফুটবল বিশ্ব সেদিন চিনেছিল ‘নেইমার জুনিয়র’ নামের এক জাদুকরকে। দীর্ঘ দেড় দশক পর, ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই একই মাঠে, একই প্রতিপক্ষের মতো বিষাদময় আবহে শেষ হলো ব্রাজিলের জার্সিতে নেইমার অধ্যায়।

​শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের বিপক্ষে ২-১ গোলের হার শুধু ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্বপ্নই গুঁড়িয়ে দেয়নি, ভেঙে দিয়েছে কোটি ফুটবল ভক্তের হৃদয়। ম্যাচ শেষে অশ্রুসিক্ত চোখে ৩৪ বছর বয়সী এই ফুটবল মহানায়ক জানিয়ে দিলেন, সেলেসাওদের হয়ে তাঁর যাত্রা এখানেই শেষ।

​চোট, ফেরা এবং কান্নায় মোড়ানো বিদায়

​এই বিশ্বকাপে নেইমারের খেলা নিয়েই এক সময় বড় সংশয় ছিল। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে মারাত্মক চোট এবং অফ ফর্মের কারণে প্রায় মাঠের বাইরেই ছিলেন তিনি। কিন্তু হার না মানা মানসিকতা আর ফুটবল ঈশ্বর কার্লো আনচেলত্তির আস্থায় বিশ্বকাপের ঠিক আগে ফিট হয়ে দলে ডাক পান তিনি।

​আশা ছিল, ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপটা রাঙিয়ে তুলবেন হেক্সা (ষষ্ঠ বিশ্বকাপ) জয়ের মহাকাব্যে। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে ব্রাজিলের একমাত্র গোলটি করে তিনি তাঁর সামর্থ্যের প্রমাণও দিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল না। ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমের টানেলে নেইমারের কান্না প্রতীকী হয়ে রইল এক অপূর্ণ স্বপ্নের। বিদায়ের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন:

​"আমি চেষ্টা করেছি, সত্যিই চেষ্টা করেছি। এখন সব শেষ। এখানেই আমার শুরু হয়েছিল, এখানেই শেষ হলো।"


​জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিলেও বর্তমান সান্তোস তারকা ক্লাব ফুটবলে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রেখে দিয়েছেন।

​"বাবা হিসেবে একটা শেষ অনুরোধ—তুমি খেলা চালিয়ে যাও"

​নেইমারের এই কঠিন সময়ে কোটি ভক্তের মতো তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় মেন্টর, গাইড এবং বাবা—নেইমার সিনিয়র। ছেলের অবসরের সিদ্ধান্তের পর ইনস্টাগ্রামে একটি অত্যন্ত আবেগঘন ও দীর্ঘ পোস্ট করেন তিনি।

​সেই পোস্টে উঠে এসেছে নেইমারের শৈশব থেকে বিশ্বসেরা হয়ে ওঠার গল্প:

  • স্বপ্নের শুরু: নেইমার সিনিয়র স্মৃতিচারণা করে লেখেন, "বিশাল একটা পথ আমরা পাড়ি দিলাম একসঙ্গে। বাধা ছিল, বিপত্তি ছিল, কষ্টও ছিল। কিন্তু পথচলায় ক্লান্তি ছিল না। এই তো সেদিনের কথা—সেই ছোট্ট ছেলেটা, পায়ে ফুটবল নিয়ে যে স্বপ্ন দেখত।"
  • গর্বিত পিতা: ছেলের সাফল্যে গর্ব প্রকাশ করে তিনি বলেন, "তোমার প্রথম গোল, প্রথম সাফল্য, ফুটবলে অভিষেক—সবটা স্মৃতিতে অমলিন। দেখলাম কেমন করে আমার ছেলেটা বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত হলো। বাবা হিসেবে এর থেকে বেশি কিছু চাওয়ার নেই আমার।"

​চিঠির শেষ অংশে এক আবেগঘন অনুরোধ জানান নেইমার সিনিয়র। তিনি চান না ফুটবলের এই জাদুকর এখনই বুটজোড়া তুলে রাখুক। তিনি লিখেছেন:

​"আমরা একসঙ্গে কেঁদেছি, হেসেছি, উদ্‌যাপন করেছি, আবার শিখেছিও... বাবা হিসেবে আমার একটা শেষ অনুরোধ—বাবা, তুমি ফুটবল খেলা চালিয়ে যাও।"


​নেইমারহীন ব্রাজিল: এক নতুন যুগের সূচনা?

​নেইমারের বিদায়ের মাধ্যমে ব্রাজিলের ফুটবলে একটি সোনালী কিন্তু ট্র্যাজিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। পেলে-রোনালদোর পর ব্রাজিলের ফুটবলকে একাই যিনি এক দশক ধরে টেনে নিয়ে গেছেন, তাঁর এভাবে বিদায় নেওয়াটা ফুটবল রোমান্টিকদের দীর্ঘকাল পোড়াবে।

​ব্রাজিল দল থেকে তো নেইমার বিদায় নিলেন, কিন্তু বাবার এই আকুল আবেদন কি তাঁর সিদ্ধান্ত বদলাতে পারবে? তিনি কি সান্তোসের হয়ে ক্লাব ফুটবল চালিয়ে যাবেন, নাকি ফুটবলকে পুরোপুরি গুডবাই জানাবেন? উত্তরটা সময়ই দেবে, তবে ফুটবল বিশ্ব চিরকাল মনে রাখবে সেই '১০ নম্বর' জার্সিধারীকে, যিনি মাঠে নামলেই এনে দিতেন নিখাদ ব্রাজিলিয়ান 'জোগো বনিতো'র আনন্দ।

Leave a Reply