ফুটবল ইতিহাসের সেই লজ্জাজনক ৯০ মিনিট, যা বদলে দিয়েছিল বিশ্বকাপের নিয়ম!

 

ফুটবল বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ রাউন্ডে চোখ রাখলেই একটা দৃশ্য খুব চেনা লাগে—একই গ্রুপের শেষ দুটি ম্যাচ মাঠে গড়ায় ঠিক একই সময়ে। দর্শক হিসেবে আমরা তখন রিমোট হাতে মহা দ্বিধায় পড়ে যাই, কোন ম্যাচ রেখে কোনটা দেখব!



​কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, ফিফা কেন এমন অদ্ভুত নিয়ম করল? কেন ম্যাচ দুটি আগে-পরে আয়োজন করা হয় না?

​এর পেছনে লুকিয়ে আছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত এবং কলঙ্কজনক ৯০ মিনিটের এক উপাখ্যান। ইতিহাসে যাকে ডাকা হয় ‘গিহোনের কলঙ্ক’ (Disgrace of Gijón) নামে। চলুন ফিরে যাওয়া যাক ১৯৮২ সালের সেই কালো অধ্যায়ে।

​⚽ নবাগত আলজেরিয়ার ইতিহাস ও পরাশক্তির অহংকার

​১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপ। মাঠের লড়াই শুরুর আগে পশ্চিম জার্মানি ছিল ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন এবং বিশ্বকাপের অন্যতম হট ফেবারিট। গ্রুপ পর্বে তাদের প্রথম প্রতিপক্ষ ছিল পুঁচকে নবাগত দেশ আলজেরিয়া।

​ম্যাচের আগে জার্মান শিবির আলজেরিয়াকে পাত্তাই দেয়নি। এমনকি তাদের এক খেলোয়াড় অহংকার করে মন্তব্য করেছিলেন:

​"সিগার ফুঁকতে ফুঁকতেও আলজেরিয়াকে হারিয়ে দেওয়া যাবে।"


​কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে অহংকারের চড়া জবাব দিল 'মরুভূমির শিয়ালেরা'। আলজেরিয়া সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে পশ্চিম জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে।

​📉 বদলে যাওয়া সমীকরণ এবং পাতানো খেলার ছক

​গ্রুপ পর্বের নিয়ম অনুযায়ী, আলজেরিয়া তাদের শেষ ম্যাচটি খেলে ফেলেছিল একদিন আগে। ৩ ম্যাচ শেষে তাদের পয়েন্ট ছিল ৪। কিন্তু সে সময় নিয়ম আজকের মতো ছিল না। আলজেরিয়ার ম্যাচ শেষ হওয়ার পর পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া খুব ভালো করেই জেনে যায়, পরের দিন ঠিক কত স্কোরলাইন হলে তারা দুই দলই পরের রাউন্ডে যাবে এবং আলজেরিয়া টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাবে।

​সমীকরণটি ছিল এমন: পশ্চিম জার্মানি যদি ১ বা ২ গোলে জেতে, তবে জার্মানি ও অস্ট্রিয়া—দুই দলই গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে পরের রাউন্ডে যাবে। আর কপাল পুড়বে আলজেরিয়ার।

​🏟️ ২৫ জুন, ১৯৮২: গিহোনের সেই ‘মঞ্চনাটক’

​স্পেনের গিহোনের এল মোলিনোন স্টেডিয়ামে মুখোমুখি দুই প্রতিবেশী দেশ পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া। ম্যাচের মাত্র ১০ মিনিটের মাথায় পশ্চিম জার্মানির হরস্ট রুবেশ গোল করে দলকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন।

​ব্যস, দুই দলের উদ্দেশ্য সফল! এরপর পুরো ৮০ মিনিট ধরে মাঠে যা চলল, তাকে ফুটবল না বলে ‘মঞ্চনাটক’ বলাই শ্রেয়।

  • নিষ্প্রাণ পাসিং: গোল করার পর কোনো দলই আর আক্রমণে যায়নি। বল পায়ে নিয়ে নিজেদের অর্ধে অলসভাবে পাস কাটাকাটি করতে থাকে তারা।
  • লজ্জাজনক পরিসংখ্যান: ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে গোলমুখে মাত্র দুটি শট নেওয়া হয়েছিল। ৫৪তম মিনিটের পর পুরো ৪০ মিনিটে একটি শটও ফায়ার করা হয়নি!
  • নিজেদের অর্ধে বল ধরে রাখা: দ্বিতীয়ার্ধে দুই দলের মোট পাসের ৫৮% ছিল নিজেদের অর্ধে, যেখানে বিশ্বকাপের স্বাভাবিক গড় থাকে মাত্র ৪১%।

​🤬 গ্যালারিতে ক্ষোভ, গণমাধ্যমে ধিক্কার

​মাঠের এই নির্লজ্জতা দেখে স্টেডিয়ামে থাকা ফুটবলপ্রেমীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন।

  • ​স্প্যানিশ দর্শকেরা চিৎকার করছিলেন—‘ফুয়েরা! ফুয়েরা!’ (বেরিয়ে যাও!)।
  • ​আলজেরীয় সমর্থকেরা ম্যাচ পাতানোর প্রতিবাদে গ্যালারিতে টাকার নোট ওড়াচ্ছিলেন।
  • ​একজন জার্মান সমর্থক এতটাই লজ্জিত হয়েছিলেন যে, ক্ষোভে নিজের দেশের পতাকাই জ্বালিয়ে দেন।
  • ​জার্মান ধারাভাষ্যকার এবেরহার্ড স্তানিয়েক সরাসরি টিভিতে বলেন, "যা হচ্ছে তা লজ্জাজনক। ফুটবলের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।" অন্যদিকে অস্ট্রিয়ান ধারাভাষ্যকার রবার্ট সিগার দর্শকদের টেলিভিশন বন্ধ করে দেওয়ার অনুরোধ জানান।

​পরদিন স্পেনের একটি নামী পত্রিকা এই ম্যাচের প্রতিবেদন খেলার পাতায় না ছেপে ছেপেছিল অপরাধবিষয়ক পাতায়!

​🛠️ ফিফার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: জন্ম নিল নতুন নিয়ম

​ম্যাচ শেষে আলজেরিয়া ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানায় এবং দুই দলকে বহিষ্কারের দাবি তোলে। কিন্তু টেকনিক্যালি পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া ফুটবল আইনের কোনো নিয়ম ভঙ্গ করেনি। তারা কেবল ফুটবলের ‘স্পিরিট’ বা সততাকে গলা টিপে হত্যা করেছিল। ফলে ফিফা সেবার কোনো শাস্তি দিতে পারেনি।

​তবে এই কলঙ্ক থেকে শিক্ষা নেয় ফিফা। ফুটবলের ইতিহাসে আর যেন কোনো দল এভাবে হিসাব কষে ম্যাচ পাতানোর সুযোগ না পায়, সেজন্য নিয়মটাই বদলে ফেলা হয়।

নতুন নিয়ম: ১৯৮৪ ইউরো এবং ১৯৮৬ বিশ্বকাপ থেকে নিয়ম করা হয়—গ্রুপ পর্বের শেষ রাউন্ডের ম্যাচগুলো একই গ্রুপে একই সময়ে অনুষ্ঠিত হবে।


​আজ আমরা রিমোট হাতে যে দ্বিধায় পড়ি, তা আসলে ফুটবলকে দুর্নীতিমুক্ত রাখার এক ঐতিহাসিক ঢাল। ‘গিহোনের কলঙ্ক’ ফুটবল ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় হলেও, তা ফুটবলকে উপহার দিয়েছে আরও স্বচ্ছ ও রোমাঞ্চকর এক নিয়ম!

Leave a Reply