মানুষ তার চারপাশে যা দেখে, তা নিয়েই বড় হয় এবং সেই অনুযায়ীই জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে। চারপাশে তাকিয়ে কেউ যদি প্রতিনিয়ত দেখে যে মানুষ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে, তখন অবচেতনভাবেই তার মনেও দেশ ছাড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। 🌍✈️
আমার চিরচেনা সিলেট অঞ্চলের কথাই ধরা যাক। এখানকার বেশিরভাগ পরিবারেরই মানসিকতা এমন—ছেলেকে যেকোনো উপায়ে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিতে হবে, আর ঘরের সবচেয়ে গুণবতী মেয়েটিকে বিয়ে দিতে হবে কোনো এক 'বিলেতি' বরের কাছে! ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে; ঘরের সবচেয়ে সেরা ও সম্ভাবনাময় ছেলেটি দেশ ছাড়ছে—হয় উচ্চশিক্ষার জন্য, নয়তো কঠোর পরিশ্রমে ভাগ্য বদলাতে। আর নিজের সন্তানদের মাঝে সবচেয়ে রূপবতী ও গুণবতী মেয়েটির ঠিকানা হচ্ছে সুদূর বিলেতে। যুগের পর যুগ ধরে এই ধারা অবিরত চলছে! 🤵👰🇬🇧
🏡 এক যৌথ পরিবারের প্রবাস-চিত্র: মেধাবীদের দেশান্তরের গল্প
আমার দাদার আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমাদের পরিবারের ছেলে-মেয়ে, নাতি-পুতিদের দিকে তাকালে এই সামাজিক বাস্তবতার এক নিখুঁত ছবি ফুটে ওঠে। আমি খুব গভীরভাবে লক্ষ্য করে দেখেছি, আমাদের বংশের বা পরিবারের সবচেয়ে মেধাবী ও সফল আত্মীয়রাই আজ দেশের বাইরে। আর আমার মতো তথাকথিত অমেধাবীরা প্রবাস থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসেও দেশে বসে ধুঁকছেন! 🫠
চলুন, আমাদের পারিবারিক বৃক্ষের (Family Tree) দিকে একবার নজর দেওয়া যাক:
💼 চাচাতো ভাই-বোনদের খতিয়ান:
- বড় চাচা ও মেঝ চাচা: স্বাধীনতার পরপরই তাঁরা পাড়ি জমিয়েছিলেন লন্ডনে। আজ বড় চাচার ছেলেদের একজন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার 🩺, আরেকজন সফল ব্যাংকার 🏦। মেঝ চাচার ছেলেদের মাঝে দুইজন আইটি বিশেষজ্ঞ 💻 এবং আরেকজন পুরোদস্তুর ফিল্ম ডিরেক্টর 🎬।
- সেঝ চাচা: তিনি দেশে ছিলেন, ‘পদ্মা অয়েল’-এর রেসিডেন্স ম্যানেজার হিসেবে অবসর নিয়েছেন। তবে তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট দুই মেয়েই আজ প্রবাসী। 🏢👩🎓
- আমার আব্বা: তিনি কৃষি ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি ডিরেক্টর ছিলেন। আমরা ৫ ভাই, যার মধ্যে ৩ জনই ইতিমধ্যেই দেশের বাইরে সেটেল্ড। বাকি যারা আছি, তারাও যাওয়ার পথ খুঁজছি! 🌾🚙
- ছোট দুই চাচা: তাঁদের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থপতি (Architect), আরেকজন দেশে থাকতে একটি আমেরিকান নামী কোম্পানিতে চাকরি করতেন। তাঁদের সন্তানদের মাঝে মাত্র ১ জন ছাড়া বাকি সবাই আজ প্রবাসী! 🏗️🇺🇸
🎓 ফুফাতো ভাই-বোনদের খতিয়ান:
ফুফুদের পরিবারের চিত্রটা আরও অবিশ্বাস্য রকমের ঈর্ষণীয় ও মেধায় ভরপুর:
- বড় ফুফু: তিনি ছিলেন প্রখ্যাত কবি বেগম সুফিয়া কামালের সুযোগ্য সহযোদ্ধা। তাঁর ৪ সন্তানের মধ্যে ২ জন আজ দেশের বাইরে। ✊📝
- মেঝ ফুফু: মেঝ ফুফা ছিলেন ওয়াপদা’র (WAPDA) চেয়ারম্যান। ফুফুর ৫ সন্তানের প্রত্যেকেই আজ আমেরিকা প্রবাসী এবং প্রত্যেকেই প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার! 🛠️🇺🇸
- সেঝ ফুফু: তিনি নিজে একজন নামকরা ডাক্তার ছিলেন। তাঁর সন্তানেরাও আজ প্রবাসী—যাদের একজন পিএইচডি (PhD) হোল্ডার এবং আরেকজন ইঞ্জিনিয়ার। 🧬🔬
- বাকি ৩ ফুফু: তাঁদের সন্তানদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র, সিংহভাগই আজ পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন।
🎯 ব্যাকবেঞ্চারদের কাঁধেই কি তবে দেশের ভার?
পরিবারের এই যখন অবস্থা, তখন বিলেত থেকে সামান্য একটি মাস্টার্স ডিগ্রিধারী, সবার চেয়ে পিছিয়ে পড়া এই 'আমি' আজ দেশে বসে আছি। অদ্ভুত এক শূন্যতা আর একাকীত্ব গ্রাস করে যখন ভাবি—বংশের সেরা মস্তিস্কগুলো আজ অন্য দেশের অর্থনীতি আর সমাজ গঠনে অবদান রাখছে, আর আমরা যারা কোনোমতে টিকে আছি, তারা দেশের মাটিতে স্ট্রাগল করছি। ☕🧱
👉 ব্লগার মুঘল সম্রাট একবার একটা দারুণ কথা বলেছিলেন—"ব্যাক বেঞ্চারেরাই আসলে দেশ চালাচ্ছেন।"
কথাটা হাসির ছলে বলা হলেও, এর ভেতরের তিক্ত সত্যটা অস্বীকার করার উপায় নেই। মেধা পাচার বা 'Brain Drain'-এর কারণে আমাদের সেরা চিকিৎসকেরা চিকিৎসা দিচ্ছেন লন্ডনে, সেরা ইঞ্জিনিয়াররা গবেষণা করছেন আমেরিকায়, আর সেরা গবেষকেরা ল্যাবে কাজ করছেন ইউরোপে। আর আমাদের দেশটা ধীরে ধীরে বঞ্চিত হচ্ছে তার সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রদের থেকে।
এটি কেবল আমার একার পরিবারের গল্প নয়, এটি সিলেট তথা সমগ্র বাংলাদেশের হাজারো মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের চিরায়ত বাস্তব চিত্র। আমরা কি আসলেই একদিন আমাদের এই ‘সেরা সন্তানদের’ দেশের স্বার্থে, দেশের মাটিতে ধরে রাখতে পারব? নাকি মেধার এই নিঃশব্দ দেশান্তর এভাবে চলতেই থাকবে? 🇧🇩💔
আপনার কি মনে হয়? মেধা পাচারের এই চক্র থেকে বের হওয়ার উপায় কী? কমেন্টে আপনার মতামত জানান! 👇

Leave a Reply