আকাশের স্বভাবটাই ছিল এমন—কেউ সাহায্য চাইলে ও কখনো 'না' বলতে পারত না। নিজের ক্ষতি করে হলেও অন্যের মুখে হাসি ফোটানোতেই ও আনন্দ পেত। বন্ধুরা বলত, "আকাশ, তুই এই যুগের ছেলে নোস। এত সরল হলে এই কঠিন পৃথিবীতে টিকে থাকা দায়।"
আকাশ শুধু হাসত। ও ভাবত, আমি যদি সবার সাথে ভালো ব্যবহার করি, তবে পৃথিবীটাও আমার সাথে ভালোই করবে। কিন্তু আকাশ জানত না, অতিরিক্ত ভালো হওয়াটাও এই সমাজে এক ধরনের অপরাধ। আর এই পৃথিবী সরলতাকে সততা নয়, বরং সুযোগ নেওয়ার চাবিকাঠি ভাবে।
সুযোগ নেওয়ার শুরু
ইউনিভার্সিটি লাইফ থেকেই আকাশের এই সরলতার সুযোগ নিতে শুরু করে ওর চারপাশের মানুষ। বিশেষ করে ওর ক্লোজ ফ্রেন্ড রাফসান।
- সেমিস্টার অ্যাসাইনমেন্ট থেকে শুরু করে প্রেজেন্টেশনের স্লাইড তৈরি—সব একা হাতে করে দিত আকাশ, আর ক্রেডিট ভাগ করে নিত রাফসান।
- পরীক্ষার আগের রাতে নিজের পড়া বাদ দিয়ে ও রাফসানকে নোট বুঝিয়ে দিত।
রাফসান প্রায়ই বলত, "দোস্ত, তুই না থাকলে আমার কী যে হতো!" আকাশ ভাবত, এটাই হয়তো আসল বন্ধুত্ব।
শিক্ষা জীবন শেষ করে দুজনেই একই কর্পোরেট অফিসে জয়েন করল। সেখানেও আকাশের স্বভাব বদলাল না। নিজের কাজের পাহাড় সামলানোর পরও কলিগদের যেকোনো অনুরোধ ও হাসিমুখে লুফে নিত। কেউ ডেটে যাবে, কেউ জলদি বাড়ি ফিরবে—সবার হয়ে ওভারটাইম ডিউটিটা একা করত আকাশ। অফিসের সবাই ওকে ভালোবাসত, কিন্তু সেই ভালোবাসাটা ছিল আসলে 'কাজের মানুষ' হিসেবে পাওয়ার স্বস্তি, সম্মান নয়।
সেই চরম আঘাত
অফিসে তখন প্রমোশনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। গত এক বছর ধরে আকাশ দিনরাত এক করে কোম্পানির একটা বড় প্রজেক্ট সফল করেছে। অথচ সেই প্রজেক্টের মেইন ফাইলে রাফসানের নামও যুক্ত ছিল।
প্রমোশনের আগের দিন রাফসান আকাশের কেবিনে এসে বলল, "দোস্ত, আমার এই প্রমোশনটা খুব দরকার। আম্মু অসুস্থ, বাড়িতে টাকার ক্রাইসিস। তুই তো জানিসই। তুই যদি বসের কাছে একটু বলতি যে এই প্রজেক্টের মেইন আইডিয়াটা আমার ছিল..."
আকাশের মনটা গলে গেল। ও ভাবল, বন্ধু তো এমনই হওয়া উচিত, যে বিপদে ত্যাগ স্বীকার করে। আকাশ বসের রুমে গিয়ে নিজের সব ক্রেডিট রাফসানকে দিয়ে দিল।
পরদিন প্রমোশনের লিস্ট ঝুলল। রাফসান টিম লিডার হলো, আর আকাশ রয়ে গেল আগের পদেই। আকাশ খুশিই হয়েছিল বন্ধুর জন্য। কিন্তু দুপুরের দিকে বসের রুমের বাইরে দিয়ে যাওয়ার সময় ও রাফসান আর বসের কথোপকথন শুনতে পেল।
বস রাফসানকে জিজ্ঞেস করছিলেন, "আকাশের পারফরম্যান্স কেমন? ওকেও কি ছোটখাটো কোনো প্রমোশন দেওয়া যায়?"
রাফসান এক গাল হেসে উত্তর দিল, "ধুর স্যার, আকাশের মাথায় বুদ্ধি-শুদ্ধি কম। ও আসলে খাটতে পারে, কিন্তু লিডারশিপ কোয়ালিটি নেই। বড্ড বোকা আর সরল টাইপের। ওকে এই পজিশনেই রাখুন, বেশি ওপরে তুললে কোম্পানিই ডুববে।"
সরলতার খোলস ভেঙে
কথাগুলো তীরের মতো আকাশের বুকে বিঁধল। যার জন্য ও নিজের ক্যারিয়ার বিসর্জন দিল, সে-ই ওকে 'বোকা' আর 'অযোগ্য' বলে সিল মেরে দিল! আকাশ সেদিন বুঝতে পারল, ও যাকে এতদিন উদারতা ভাবত, এই পৃথিবী আসলে সেটাকে ওর দুর্বলতা ভেবে এসেছে।
সেদিন বাড়ি ফিরে আকাশ আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের ভেতরের সেই অতি-ভালো মানুষটাকে ও চিরতরে বিদায় জানাল। ও বুঝল, সবাইকে খুশি করার দায়িত্ব ওর নয়। অতিরিক্ত ভালো হওয়াটা আসলে নিজের প্রতি অন্যায়।
এক নতুন আকাশ
পরের সপ্তাহ থেকেই অফিসের মানুষগুলো এক অন্য আকাশকে দেখতে পেল।
- পাশের টেবিলের কলিগ যখন নিজের ফাইল এগিয়ে দিয়ে বলল, "আকাশ ভাই, একটু দেখে দিন না।" আকাশ শান্ত গলায় বলল, "দুঃখিত, আমার নিজের কাজই বাকি আছে। আপনি আপনারটা করে নিন।"
- রাফসান যখন আবার নতুন কোনো সুবিধার জন্য এগিয়ে এল, আকাশ সরাসরি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "ব্যক্তিগত সুবিধা আর প্রফেশনাল লাইফ—দুটো আলাদা রাখতে শেখো, রাফসান।"
আকাশের এই 'না' বলাটা অনেকে অহংকার ভাবল, কেউ কেউ বলল ও বদলে গেছে। কিন্তু আকাশ জানত, ও বদলায়নি। ও শুধু নিজের সীমানা (Boundary) টেনে দিয়েছে। এই পৃথিবীতে সরল মন নিয়ে বাঁচতে হলে পিঠে একটা শক্ত চামড়াও থাকতে হয়, নইলে মানুষ ছিঁড়ে খেয়ে ফেলে। আকাশ এখন আর সবার প্রিয় হতে চায় না, ও শুধু নিজের কাছে সৎ আর একটু বাস্তববাদী হতে শিখেছে।

Leave a Reply