মানুষের জীবনের কিছু সত্য এত বেশি নির্মম হয় যে, তা আড়াল করাই শ্রেয়। আকাশের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই করা হয়েছিল। আকাশের ঠিক কী হয়েছিল, তা তাকে কোনোদিনই বলা হয়নি। কারণ, চরম সেই সত্যিটা শুনলে তার মানসিক আর শারীরিক অবস্থা মুহূর্তের মধ্যে আরও বেশি ভেঙে পড়ত। তাই ওর মস্তিষ্কে যে মরণব্যাধি ব্রেইন টিউমার বাসা বেঁধেছে, সেই খবরটা আকাশের কাছ থেকে সম্পূর্ণ গোপন রাখা হলো।
তবে এই কঠিন সত্যটি লুকিয়ে রাখা যায়নি তার বন্ধুদের কাছ থেকে। খুব সতর্কতার সাথে, বুকভরা কান্না চেপে চিকিৎসকেরা আকাশের বন্ধুদের রিপোর্টটি দেখালেন। খবরটা শোনা মাত্রই কেউ আর চোখের জল ধরে রাখতে পারল না। চারপাশের চেনা বাতাস এক নিমেষেই ভারী হয়ে উঠল।
নাবিলার অনুশোচনা
পরীক্ষা শেষ হতেই আকাশের এই খবরটা নাবিলার কানে পৌঁছাল। মুহূর্তের মধ্যে সব কাজ ফেলে সে হন্যে হয়ে ছুটে এলো আকাশকে দেখতে। কেবিনের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে যখন সে আকাশের সব কথা শুনল, তখন এক তীব্র অপরাধবোধ তাকে গ্রাস করতে লাগল।
বুকের ভেতর চেপে রাখা একটা দীর্ঘশ্বাস তাকে ক্ষতবিক্ষত করছিল। ও যে মনে মনে আকাশকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছিল, সেই কথাটা তো আজ পর্যন্ত আকাশকে বলাই হলো না! অভিমানে, ভালোবাসায় আর হারানোর ভয়ে নাবিলা কান্নায় ভেঙে পড়ল।
সেদিন হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে নাবিলা দুই হাত তুলে সৃষ্টিকর্তার কাছে আকুল প্রার্থনা করেছিল:
"হে আল্লাহ, তুমি আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও আকাশের জীবনটা ভিক্ষা দাও। ও যেন সুস্থ হয়ে ফিরে আসে।"
নির্মম বিদায়
কিন্তু নিয়তির লিখন হয়তো অন্যরকম ছিল। নাবিলার সেই আর্তনাদ, বন্ধুদের নীরব কান্না কিংবা চিকিৎসকদের শত চেষ্টা—কোনো কিছুই আর কাজে এল না। সব মায়া, সব ভালোবাসা আর অপূর্ণ ইচ্ছেগুলোকে পেছনে ফেলে নির্মম মৃত্যু আকাশকে সবার কাছ থেকে চিরদিনের জন্য কেড়ে নিলো। সাদা চাদরে ঢাকা আকাশের নিথর দেহটার দিকে তাকিয়ে নাবিলা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
অবশেষে নাবিলা বুঝতে পারল, সে বড্ড বেশি দেরি করে ফেলেছে। মনের কথাটি প্রকাশের জন্য যে সময়টুকু প্রয়োজন ছিল, নিষ্ঠুর সময় তাকে আর সেই সুযোগটা দিল না। কিছু প্রকাশ না পাওয়া ভালোবাসার গল্প এভাবেই অনন্তকালের জন্য অপূর্ণই থেকে যায়।

Leave a Reply