ভেবেছিলাম আদরে রাখবো, পেলাম শুধুই অপমান!

 

সেদিন একটা দরকারে ওদের বাড়ি গিয়েছিলাম। আর সেখানেই তাকে প্রথম দেখা। হালকা নীল শাড়িতে, একরাশ সরলতা চোখে-মুখে মেখে যখন সে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল, আমি প্রথম দেখাতেই ওর মায়ায় পড়ে গিয়েছিলাম। ওর তাকানো, কথা বলার মিষ্টি ধরন—সবকিছু মন ছুঁয়ে গিয়েছিল।



​পরে জানতে পেরেছিলাম, মেয়েটার বাবা-মা থেকেও নেই। মামার বাড়িতে অন্যের আশ্রয়ে বড় হয়েছে। মনে মনে ভেবেছিলাম, যে মেয়েটা ছোটবেলা থেকে এত কষ্ট আর একাকীত্বের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে, তাকে যদি নিজের করে পাই, তবে বুকের সমস্ত আদর দিয়ে আগলে রাখবো। জীবনে আর কখনো কোনো কষ্টের আঁচ তাকে ছুঁতে দেবো না।

​কিন্তু কল্পনা আর বাস্তবতা যে এতটা আকাশ-পাতাল তফাত হতে পারে, তা আমার জানা ছিল না।

​বদলে যাওয়া রূপ

​সম্পর্কের বয়স বাড়ার সাথে সাথে ওর ভেতরের আসল মানুষটা বেরিয়ে আসতে লাগল। এখন একটু ব্যস্ততার কারণে ফোন ধরতে না পারলেই ওপার থেকে মুখের ভাষা পুরো পরিবর্তন হয়ে যায়। যে ভাষার ব্যবহার আমি ওর মুখে কখনো কল্পনাও করিনি, সেই ভাষায় ও আমায় আঘাত করে।

​ও যখন ফোন দেয়, আমি ব্যস্ত ছিলাম নাকি ফ্রি—সেটা জানার কোনো প্রয়োজনই মনে করে না। নিজের মতো একটা কাল্পনিক গল্প সাজিয়ে নিয়ে শুরু করে অপবাদ দেওয়া। কথায় কথায় বান্ধবীদের প্রেমিকদের উদাহরণ আসে—কার প্রেমিক তাকে কোথায় ঘুরতে নিয়ে গেল, কী উপহার দিল, তাই নিয়ে চলে মেজাজ গরম করা।

​সবচেয়ে বেশি গায়ে লাগে যখন ও বড়াই করে বলে, সে আমার সাথে কথা বলে এটাই নাকি আমার ভাগ্য! অহংকার করে আমায় 'ফকিন্নির বাচ্চা', 'কুত্তা' বলে গালিগালাজ করতেও ওর মুখে বাঁধে না।

​ও কি আসলেই জানে আমি কী? আমি নিজেকে ওর সামনে সবসময় ছোট করে, সাধারণ করে রাখি বলে ও আমায় সস্তা ভেবে নিয়েছে। অথচ আমার জীবনে আমি যে পরিমাণ আনন্দ করেছি, যে খরচ করেছি, তার এক অংশও ও কখনো চোখে দেখেছে বলে আমার মনে হয় না। কিন্তু আমার তো বড়াই করার স্বভাব নেই, নিজেকে বড় দেখানোর কোনো অহংকারও আমার নেই।

​অহংকার বনাম বাস্তবতা

​ও প্রায়ই ওর কোটিপতি মামার বাড়ির গল্প করে। এটা ভালো, মামার প্রতি ওর কৃতজ্ঞতা থাকতেই পারে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, ও সেই মামার বাড়ির সাথে আমার তুলনা করে। একদিন তো হেসেই ফেললাম, যখন ও বলল—তার মামার পায়ের জুতাও নাকি আমার চেয়ে বেশি মূল্যবান!

​আমি মনে মনে হাসি আর ভাবি—ও তো জানে না, ওই বাড়িতে ওর নিজের মূল্য কতটুকু? আর কতদিনই বা ও এই আদরে থাকবে? কেনই বা ও এই আদরটা পাচ্ছে! মামা কোটি টাকার মালিক হতে পারে, কিন্তু সেখানে ওর নিজের কী আছে? ও সেখান থেকে কী পাবে?

​আমার যা আছে, তা হয়তো কোটি টাকার চেয়েও বেশি। হ্যাঁ, ও যাকে 'ফকিন্নির সন্তান' বলে গালি দেয়, তার নিজের একটা সুন্দর বাড়ি আছে। বাড়িতে যা যা দরকার, তার কোনো কিছুর কমতি আছে বলে আমার জানা নেই। আমার ভাগ্যে যে আসবে, সে কী পাবে তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই। তার জন্য এখনই ৬-৭ ভরি স্বর্ণের গহনা বানিয়ে রাখা আছে। নিজের জমানো নগদ ৫ লাখ টাকা আলাদা করা আছে শুধু বিয়ের কেনাকাটার জন্য। কোনো অভাব বা পরে ভাবার মতো কোনো পরিস্থিতি আমার পরিবারে নেই।

​কিন্তু অহংকার তো পতনের মূল। তাই নিজেকে জাহির করার কোনো প্রয়োজন আমি বোধ করি না। নিজের সততা, ঈমান আর নীতি ঠিক রেখে আমি শুধু জীবনের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই।

​শেষ বিদায়ের সিদ্ধান্ত

​আমি যদি ওর চোখে এতই খারাপ, এতই ছোট হই, তবে আমার মতো একটা 'কুত্তা' বা 'ফকিন্নির' সাথে কথা বলে নিজের মান নষ্ট করার ওর কী দরকার? ও আমার চেয়ে অনেক ভালো কাউকে পাওয়ার যোগ্যতা রাখে। ওর পেছনে হাজারটা ছেলে ঘোরে, আমার চেয়ে ধনী ছেলের ওর অভাব হবে না। আমি কেন জোর করে খারাপ হয়ে ওকে ধরে রাখতে যাব?

​অন্য কোনো ছেলে ওকে খুব সম্মান করবে, মাথায় করে রাখবে, দামি দামি জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যাবে, আর টাকা-পয়সা দিয়ে ভরিয়ে রাখবে—আমি এখন সেটাই চাই।

​আমি অপেক্ষায় রইলাম। আল্লাহ যদি আমার ভাগ্যে রাখেন, তবে আমি দূর থেকেই দেখে যাব—সে কেমন মানুষ পায়। কে তাকে কতটা সম্পদ দিয়ে, অট্টালিকায় রেখে আজীবন খুশি রাখতে পারে।

​আমি বুঝতে পেরেছি, অহংকারী রাজকন্যার জন্য আমার এই সাধারণ জীবন নয়। আমি তো আমার এই কুঁড়েঘরটাতেই একটু শান্তি চাই, যেখানে কোনো অবহেলা আর কটূক্তি থাকবে না। অট্টালিকার ওই বিলাসী অহংকার আমার দরকার নেই।

Leave a Reply