নিজেদের জমিতে কৃষিকাজ করতে গিয়ে ল্যান্ডমাইন বা স্থল মাইন বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছেন তিন বাংলাদেশি নাগরিক। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে এই ধরনের ভয়াবহ হতাহতের ঘটনা নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা সংকটের পর থেকে আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। সীমান্ত পরিস্থিতি, মাইনের রহস্য এবং এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের কৌশল নিয়ে সম্প্রতি বিবিসি বাংলায় উঠে এসেছে এক বিশদ বিশ্লেষণ।
সীমান্তে সতর্কতা ও প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা
সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে চলাচলের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বিবিসি বাংলাকে জানান, বিজিবির মাধ্যমে সীমান্ত এলাকার কৃষি জমিগুলোতে বিশেষ সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো হচ্ছে। তবে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সাধারণ প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করে তিনি বলেন:
"সীমান্তের পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা যেহেতু বিজিবি নিবিড় তত্ত্বাবধান করে, ওই এলাকায় সাধারণ প্রশাসনের সরাসরি খুব বেশি কিছু করার নেই।"
সীমান্ত আসলে কার নিয়ন্ত্রণে? কারা পাতছে এই ল্যান্ডমাইন?
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকাটি নদী, পাহাড় এবং সমতল মিশ্রিত অত্যন্ত দুর্গম এক অঞ্চল। বর্তমানে এই সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ এবং ল্যান্ডমাইন স্থাপনের রহস্য নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, সীমান্তের এই অংশে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারি বাহিনীর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই; বরং তাদের সরিয়ে আরাকান আর্মি (Arakan Army) নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
তিনি আরও জানান, শুধু আরাকান আর্মিই নয়, এই অঞ্চলে আরও বেশ কিছু স্বাধীনতাকামী, বিদ্রোহী এবং জঙ্গি সংগঠন তৎপর রয়েছে। ফলে সুনির্দিষ্টভাবে কারা এই মাইন পুঁতে রাখছে, তা চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব।
"জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী মাইন পাতা হলে আলাদা করে জায়গাটাকে চিহ্নিত করে দিতে হয়, কারণ মাইনের উদ্দেশ্য শত্রু আক্রমণকে ধীর করে দেওয়া। কিন্তু এখানে শত্রু অজানা এবং জেনেভা কনভেনশন মানার কোনো বিষয়ও এখানে নাই।"
— ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ
তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশের ভেতরে চাঁদাবাজি করতে দেখা গেলেও, মাইন বিস্ফোরণে কখনো তাদের কোনো ক্ষতি হয়নি। এর অর্থ দাঁড়ায়, যারা মাইন বসাচ্ছে তারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবেই বিজিবি ও স্থানীয়দের টার্গেট করে এগুলো বসিয়েছে।
সমাধানের পথ কী?
এই জটিল ও বিপজ্জনক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং সরকারি কর্মকর্তারা কয়েকটি প্রধান বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন:
১. গোয়েন্দা নজরদারি ও কাঁটাতারের বেড়া
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে অতি দ্রুত গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সাথে, বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার যে সরকারি উদ্যোগ রয়েছে, তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
২. কড়া কূটনৈতিক প্রতিবাদ
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক মো. তৌফিক উর রহমান জানান, সীমান্ত পেরিয়ে আসা গুলি, বিস্ফোরক বা স্থল মাইনের বিষয়ে ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমার দূতাবাস এবং ইয়াঙ্গুনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে মিয়ানমার সরকারের কাছে নিয়মিত তীব্র প্রতিবাদ ও উদ্বেগ জানানো হচ্ছে।
৩. আন্তর্জাতিক চাপ বজায় রাখা
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা দূর না হলে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান কঠিন। তাই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জনমত গঠন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাথে আলোচনা এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরার কৌশল নিয়েছে ঢাকা। এছাড়া আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোকে সচল রেখে দেশটির ওপর কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখার চেষ্টা চলছে।
শেষ কথা
সীমান্তে নিজেদের ভূখণ্ডে কাজ করতে গিয়ে সাধারণ বাংলাদেশিদের প্রাণ হারানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একদিকে যেমন কূটনৈতিক স্তরে মিয়ানমারকে চাপে রাখার আন্তর্জাতিক চেষ্টা চালাতে হবে, অন্যদিকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নাগরিকদের সুরক্ষায় সীমান্তে বিজিবির সক্ষমতা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের এই অস্থিতিশীলতা ও মাইন আতঙ্ক দূর করতে বাংলাদেশের আর কী ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন? আপনার মতামত কমেন্ট বক্সে শেয়ার করুন।
Leave a Reply