উজান থেকে আসা পানি ও আকস্মিক বন্যা: বাংলাদেশ-ভারত নদী রাজনীতির অমীমাংসিত জটিলতা

 


বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ, তবে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এ দেশের নদীগুলোর ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করে উজানের দেশগুলোর ওপর। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব আর বর্ষায় হঠাৎ আসা বন্যা—এই দুই চরম সংকটের মুখোমুখি হতে হয় বাংলাদেশকে। সম্প্রতি বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উজান থেকে আসা পানি, বাঁধের গেট খুলে দেওয়া এবং যৌথ নদী কমিশনের কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের নানা মতামত।

​"উজানে বৃষ্টি হলে বাঁধ খুলে দেয়, শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে রাখে"

​নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক নদীগুলোর উজানে থাকা দেশগুলো যখন অতিরিক্ত বৃষ্টির চাপের মুখে পড়ে, তখন নিজেদের বন্যা পরিস্থিতি সামাল দিতে বাঁধের গেট খুলে দেয়। নদী বিশেষজ্ঞ মি. কিবরিয়া বিবিসি বাংলাকে বলেন,

​"যখন আপস্ট্রিমে (উজানে) বৃষ্টি হয় তখন তো আর পানি ধারণ করে রাখতে পারে না, বাঁধ খুলে দেয়। যখন উপর থেকে পানি ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে তখন বন্যা হচ্ছে। আবার যখন পানি থাকে না, তখন আমাদের নদীগুলো ভরাট হচ্ছে, দখল হচ্ছে।"


​একদিকে শুষ্ক মৌসুমে উজানের দেশগুলো বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখায় বাংলাদেশের নদীগুলো শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়, ব্যাহত হয় সেচ ও স্থানীয় জীবনযাত্রা। অন্যদিকে, বর্ষায় হঠাৎ বাঁধের গেট খোলার ফলে বাংলাদেশে দেখা দেয় আকস্মিক ও বিধ্বংসী বন্যা।

​দেশের ভেতরের ড্রেনেজ সিস্টেম কি দায়ী?

​শুধু উজানের পানিই নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেও এই সংকটের বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। মি. কিবরিয়া আরও যোগ করেন, আমাদের দেশে বৃষ্টির প্রবণতা খুব একটা না বদলালেও খাল, নদী, নালা সংকুচিত হয়ে গেছে। নদীর গভীরতা কমেছে এবং ব্যাপকভাবে নদী দখল হয়েছে। ফলে উজান থেকে আসা বাড়তি পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার পথ পাচ্ছে না।

​এক্ষেত্রে ভারত ও নেপালের মতো উজানের দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ নদী কমিশনের (JRC) মাধ্যমে কার্যকর সমঝোতা ও পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

​ভারত কি সময়মতো ও পর্যাপ্ত তথ্য দিচ্ছে?

​বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণের জন্য দুই দেশের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের নিয়ম রয়েছে। ভারতের সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশন এবং বাংলাদেশের পানি উন্নয়ন বোর্ড সরাসরি এই তথ্য আদান-প্রদান করে।

​বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানান, নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছরের মে মাস থেকে উজানের ১৪টি পয়েন্টের তথ্য বাংলাদেশের সঙ্গে লেনদেন করে ভারত।

​তবে এই তথ্য আদান-প্রদানকে "পর্যাপ্ত নয়" বলে মনে করেন যৌথ নদী কমিশন বাংলাদেশের নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী শহীদুর রহমান। তিনি বলেন,

​"আমরা ভারতের কাছে আরও বেশি তথ্য চাচ্ছি। কিন্তু আমাদের যে প্রত্যাশা সে অনুযায়ী বিপরীত পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।"


​যদিও বন্যা এবং বাঁধের গেট খোলার তথ্য সময়মতো না দেওয়ার অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে ভারত।

​সরকারের অবস্থান ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনা

​এই দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা দূর করতে সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক আলোচনার কথা বলা হচ্ছে। পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বিবিসি বাংলাকে জানান, নদীর পানি বণ্টন ও তথ্য লেনদেন ইস্যুতে সহায়তা বাড়াতে ভারতের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে। বিগত দিনের তুলনায় বর্তমানে বাঁধের গেট খুলে দেওয়ার বিষয়গুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ বা মনিটর করা হচ্ছে এবং দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রয়েছে।

​শেষ কথা

​তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির মতো দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলো ঝুলে থাকায় প্রতি বছরই লাখ লাখ মানুষকে বন্যার দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বাংলাদেশের নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, অভ্যন্তরীণ নদী দখলমুক্ত করা এবং আন্তর্জাতিক নদী আইনের ভিত্তিতে উজানের দেশগুলোর কাছ থেকে সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত তথ্য আদায় করা—এই দুই ফ্রন্টেই এখন ঢাকাকে শক্ত কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক ভূমিকা নিতে হবে।

উজান থেকে আসা পানির এই স্থায়ী সংকট সমাধানে আপনার মতামত কী? দ্বিপাক্ষিক আলোচনা নাকি আন্তর্জাতিক আদালতের হস্তক্ষেপ—কোনটি বেশি কার্যকর হবে? কমেন্ট করে আমাদের জানান!

Leave a Reply